পুরুলিয়ার রাখাল বালক থেকে অধ্যাপক ডঃ শক্তিপদ কুমার হয়ে ওঠার গল্প

0
5137
Dr. Shaktipada Kumar
Dr. Shaktipada Kumar

ছৌ নাচ নিয়ে Ph.D.!!!!! উটা আবার কী রকম? সেটাও English Literature এ কি করে সম্ভব? অনেকেই নাক সিটকেছিলেন, অনেকেই অবাক হয়েছিলেন, অনেকেই ইয়ার্কি ঠাট্টাও করেছেন গবেষণার বিষয় শুনে। অনেকেই এই বিষয়ে গবেষণার জন্য ফোনে বহুবার যোগাযোগও করেছেন শক্তিপদর (Dr. Shaktipada Kumar) সাথে। এই পথ চলাটা শুরু হয়েছিল Ph.D. তে ভর্তি হওয়ার আগে থেকেই, যখন M.A. করার জন্য হায়দরাবাদ এ  যান 2011 তে। অনেকটাই discriminated হতে হয়েছিলো M.A. করাকালীন, Ph.D. পাওয়ার পরেও সেই discrimination টা অনেকদিন continue হয়েছিলো। এই discrimination টা অনেকটাই পুরুলিয়ার ছেলে বলে, আর সেখান থেকেই পুরুলিয়ার প্রতি শক্তির ভালোবাসাটা দিন দিন গভীর থেকে গভীরতর হতে থাকে।

রাখাল বালক শক্তিপদ কুমারের গল্প :
তার স্মৃতিচারণ থেকে উঠে আসে যে, সে সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মায়নি, তবে জন্মানোর 5 বছরের মধ্যেই হাতে পেয়েছিলেন রাখাল বালকের হাতিয়ার, মানে একটা লাঠি, যা নিয়ে রোজ গরু, ছাগল চরাতে মাঠে যেতেন আর বগলে গুঁজে নিয়ে যেতেন একটি বই। মাধ্যমিক পর্যন্ত রোজ তাকে গরু, ছাগল নিয়ে মাঠে যেতে হতো।  বাবা মা ছিলেন বিড়ি শ্রমিক তাই অর্থের সংকট লেগেই থাকতো আর ছাগল বিক্রি করে মাঝে মধ্যে কিছু টাকা আয় হতো বলেই বাড়িতে ছিলো ছাগলের এক বিরাট পাল। গ্রামের লোকের প্রতি বাড়িতেই এরকম কিছু না কিছু গৃহপালিত প্রাণী পোষা হয় যা দিয়ে বিশেষ কোনো কাজে বিক্রি করে অর্থের আগমন হয়। শক্তিপদর বাড়িতে এখনো এরকম ছাগল এর পাল আছে। বাবা একরকম শেষ বয়সে (44 বছর) প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হন। অর্থকষ্ট ঈষৎ কম হয়। তবে বড় সংসার (15 জন) বলে নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা।

ছোট থেকেই জেদি :
পড়াশোনাতে খুব একগুঁয়েমি আর সাংঘাতিক জেদি হওয়ায় ক্লাস এ বরাবর প্রথম স্থান অধিকার করতেন। আজো তার মনে পড়ে সেই দিনের কথা, যেদিন সে জীবনে প্রথমবারের মতো ক্লাস এ দ্বিতীয় হয়েছিলেন আর সেটা ছিলো মাধ্যমিক এর সময়। প্রথম হতে না পারার যে জ্বালা, যে যন্ত্রনা সেটা এতটাই তীব্র হয়েছিলো যে ওই স্কুল এ আর পড়াশোনা করবেন না এমনটাই ঠিক করেছিলেন (স্কুলের হাতে থাকা কিছুটা নম্বর কেটে নেওয়া হয়েছিলো তাই)। ভর্তি হয়ে গেলেন পুরুলিয়া জেলার সবথেকে বড় স্কুল (খুব সম্ভবত, ছাত্রসংখ্যা অনুযায়ী) তথা নপাড়া উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় এ।

যদিও সে এই মাধ্যমিক এর পর জীবনে আর কোনোদিন প্রথম হয়ে উঠতে পারেননি। তার জীবনের সব থেকে বড়ো এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়তো নপাড়া স্কুল এ ভর্তি হওয়াটা। ভর্তি হয়েছিলেন বিজ্ঞান বিভাগে কিন্তু বেশিদিন ভালো না লাগায়, টিকতে না পারায় অবশেষে কলা বিভাগে ভর্তি হয়ে যান। মাধ্যমিক এ ভালোরকম হোঁচট খেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক এ ভালো রেজাল্ট করে বুক ফুলিয়ে ভর্তি হলেন জেলার সেরা কলেজ জগন্নাথ কিশোর কলেজ এ। ওই বুক ফোলানো মাত্রই সার, দ্বিতীয় বর্ষ পর্যন্ত ফার্স্ট ক্লাস ছিলো, তারপর তৃতীয় বর্ষে এসে মেরুদন্ড ভেঙ্গে দেওয়ার মতো বাজে ফলাফল। তার কথামতো ক্লাস এ ফার্স্ট হওয়ার ভূত মাধ্যমিক এর পরেই নেমে গিয়েছিলো আর কলেজে এসে ফার্স্ট ক্লাস পাওয়ার ভূতটাও নেমে গেলো। পড়াশোনা করবেন না এরকমই একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, ভেবেছিলেন সিভিল সার্ভিস এর জন্য পড়াশোনা করবেন আর যদি একান্তই পড়াশোনা করতে হয় তাহলে পশ্চিমবঙ্গে নয়। স্নাতকোত্তর করার জন্য প্রবেশিকা পরীক্ষা দিলেন দিল্লীর জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে আর হায়দ্রাবাদের ইংরেজি এবং বিদেশি ভাষা বিশ্ববিদ্যালয় এ। হায়দ্রাবাদে পড়ার সুযোগ পেয়ে গেলেন। স্নাতক এ খুব কম নম্বর পাওয়ার জন্য RTI করে সমস্ত উত্তরপত্রের প্রতিলিপিও বার করেছিলেন যদি কিছু নম্বর বাড়ানো যায় ভেবে। তার এক বিশিষ্ট শিক্ষক (অধ্যাপক অপূর্ব সাহা) বললেন যে আর RTI করে লাভ নেই, হায়দ্রাবাদ চলে যা অনেক সুযোগ সুবিধা পাবি।

হায়দ্রাবাদে পথ চলা শুরু :
স্যার এর কথামত শক্তিপদ কুমার (Dr. Shaktipada Kumar) হায়দ্রাবাদ এর উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন, জীবনে যেনো এক নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। মানভূমি বাংলা ছাড়া আর কোনো ভাষাতেই সেরকম কথা বলতে পারতেন না, একটু একটু করে হিন্দি আর ভাঙা ভাঙা ইংরাজি বলতে শুরু করলেন। নিজের জেলা ছাড়িয়ে ভিন রাজ্যে ওই প্রথম পাড়ি দিলেন একা একা। ট্রেন এ আপার বার্থ এ সিট পেয়েছিলেন, সেই যে হাওড়া তে আপার বার্থ এ উঠে বসলেন আর ভয়ে নামেননি একবারও। বার্থ এ বসেই কাটিয়ে দিলেন প্রায় 30 ঘন্টা। শুনেছিলেন যে খুব চুরি হওয়ার সম্ভাবনা তাই ব্যাগ টাও বার্থ এ তুলে নিয়েছিলেন আর জুতো খুলে রেখেছিলেন ফ্যান এর ওপরে। বাইরের খাবার খাওয়া মানা তাই ব্যাগ এ যে অল্প চিড়ে, চিনি আর ছাতু ছিলো তাই দিয়েই কাটিয়ে দিলেন 30 ঘন্টা। তার কুপ এর যাত্রীরা কিছুটা অবাক ও অদ্ভুত হয়েই দেখছিলেন যে ছেলেটা জুতো পর্যন্ত ফ্যান এর উপরে তুলে দিয়েছেন আর ব্যাগ এর উপরে পা তুলে কোনোমতে সংকুচিত হয়ে জুবড়ে অর্ধ সায়মান অবস্থায় ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিচ্ছেন। যদিও তার কিছুই এসে যায় না কে কি ভাবলো তাই নিজের সার্টিফিকেট আর গুরুত্বপূর্ণ জিনিস ধরে কোনোমতে স্লিপার ক্লাস এ সময় টা কাটিয়ে দিলেন।

সেকেন্দ্রাবাদ এ পৌঁছলেন আর দেখলেন যে, অটোওয়ালারা নতুন দেখে অনেক বেশি টাকা চাইছেন উনিভার্সিটি নিয়ে যাওয়ার জন্য, তাই গেলেন না। তার কোনো হোটেল বা লজ বুক করা ছিলো না কারণ সেসব কিছু জানতেন না যে কিভাবে করতে হয় বা সেরকম কেউ ছিলেন না করে দেওয়ার মতো। তাছাড়া হোটেল এ থাকার মতো টাকা তার কাছে ছিলো না কারণ বাড়ি থেকে ওই সময় খুব একটা টাকা হাতে দিয়ে পাঠাতে পারেন নি, তার স্যার কিছুটা টাকা দিয়ে পাঠিয়ে ছিলেন আর ওটাই ছিলো একমাত্র সম্বল। অটো করতে পারেননি 150 টাকা চাওয়ায় তাই ট্রাফিক পুলিশ এর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে নেন যে কোন বাস যায় উনিভার্সিটির দিকে, পুলিশ বলে দিলেন বাস নম্বর আর সেই মতো বাস এ উঠে 6 টাকায় পৌঁছে গেলেন তার স্বপ্নের উনিভার্সিটি তে। হোস্টেল এ গিয়ে হিন্দিতে বললেন যে “কাল মেরা এডমিশন হে, হোস্টেল মে রেহনে কা জাগাহ মিলেগা ক্যা?” একটা গেস্ট রুম দিলেন 25 টাকা করে চার্জ প্রতিদিনের হিসেবে। সে তো ভীষণ খুশি যে এত্ত কম টাকায় থাকতে পারবেন। পরের দিন ভর্তি হয়ে গেলেন আর শুরু হয়ে গেলো জীবনের এক নতুন অধ্যায়।

M.A. শেষ করার পর শক্তিপদ কুমার (Dr. Shaktipada Kumar) Ph.D. তে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়ে গেলেন। গবেষণা শুরুর 2 বছরের মধ্যেই পেলেন জীবনের সবথেকে বড়ো আঘাত, হঠাৎ করে বাবা তাকে ছেড়ে চলে গেলেন। গবেষণার কাজ প্রায় 6 মাস বন্ধ; তার Supervisor ভেবেছিলেন যে শক্তি হয়তো আর রিসার্চ এ ফিরে আসতে পারবেন না কিন্তু উনি অনেক সাহস জুগিয়ে আবার ফিরিয়ে আনলেন গবেষণায়। খুব অল্প scholarship এ রিসার্চ করতেন এবং সেই অল্প টাকাটাও বন্ধ হয়ে গেলো 4 বছর পর কারণ 4 বছর পর আর কোনোরকম scholarship দেওয়া হয় না। এদিকে রিসার্চ এর তখনও পুরো 1 টা বছর বাকি, কী করে খরচা চালাবেন তাই ভেবে রিসার্চ পুরো শিকেয় উঠে গিয়েছিলো। টাকার জন্য বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করেন কিন্তু কোনোরকম সাহায্য মেলেনি; পুরুলিয়ার সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণা করছেন বলে খুব আশা নিয়ে যোগাযোগ করেছিলেন পুরুলিয়ার তৎকালীন D.M. সাহেবের কাছে কিন্তু প্রত্যুত্তরে মিষ্টি কথা ছাড়া কোনোরকম আর্থিক সাহায্য মেলেনি।

কিছু ঘনিষ্ট বন্ধু আর শিক্ষক এর সহায়তায় কোনোমতে রিসার্চ এর শেষ বছর টা চালান ও গবেষণাপত্রটি জমা দিতে সক্ষম হন। Ph.D. জমা করে পুরুলিয়া ফিরে আসেন শক্তিপদ কুমার (Dr. Shaktipada Kumar), কয়েকটা দিন বাড়িতে থাকার পর চলে যান কলকাতা চাকরির খোঁজে। একটার পর একটা ইন্টারভিউ দিতে থাকেন কিন্তু কোথাও কোনোরকম চাকরি হলো না। অবশেষে একটা গবেষণা কেন্দ্রে [Centre for Knowledge Ideas and Development Studies (KnIDS), Kolkata] একটা কাজের সুযোগ হয় এবং সেটাই করতে থাকেন। ওই কাজ করতে করতেই বিভিন্ন জায়গায় ইন্টারভিউ দিতে থাকেন। কম করেও 15 টা ইন্টারভিউ দেওয়ার পর দীর্ঘ প্রতীক্ষিত, আশানুরূপ কাজের সুযোগ হলো। বর্তমানে পুরুলিয়ার ফস্কোর রাখাল বালক কোচবিহার পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরাজি বিভাগের অধ্যাপক।

Dr. Shaktipada Kumar
Dr. Shaktipada Kumar

UNESCO এর International Dance Council এর মেম্বারশিপ :
গবেষণা করাকালীন এবং গবেষণার পরবর্তী সময়ে রাশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড এর বিভিন্ন জায়গায় দাপিয়ে বেরিয়েছেন এবং প্রচার ও প্রসার করেছেন পুরুলিয়ার লোকসংস্কৃতিকে। মিলেছে UNESCO এর International Dance Council এর মেম্বারশিপ। তার কীর্তি এখানেই থেমে থাকেনি, কিছুদিন আগেই জার্মানির এক বিশেষ গবেষক তথা তথ্যচিত্র পরিচালকের “What Moves Us” সিনেমায় বিশ্বের 15 জন Ethnomusicologist এবং তাদের সংস্কৃতি নিয়ে তৈরি সিনেমায় জায়গা করে নিয়েছেন এই বালক।

ছৌ নাচ এর প্রতি ভালোবাসা :
নিজে ৭ বছর ধরে পাগলের মতো চষে বেরিয়েছেন পুরুলিয়া তথা মানভূম ও তৎসংলনগ্ন জায়গায় এবং ডকুমেন্ট করেছেন পুরুলিয়া তথা মানভূমের নানান সাংস্কৃতিক আঙ্গিক তার মধ্যে প্রধান বিষয় ছৌ নাচ। একা হাতে তৈরি করে ফেলেছেন একটা আস্ত তথ্যচিত্র যেখানে Ritual আর Performance এর গভীর সম্পর্ক নিয়ে আলোকপাত করেছেন। গ্রামে রয়েছে নিজের ছৌ নাচের দল, মাঝে মাঝে ঝুমুর রচনা, সুর দেওয়া ও রীতিমতো ঝুমুরের চর্চা করা তার জীবনের একটা বড়ো অঙ্গ। সম্প্রতি আনুষ্ঠানিক ভাবে শুভমুক্তি পেয়েছে তার পরিচালিত প্রায় 55 মিনিট এর একটা তথ্যচিত্র; আয়োজক- বিপন্ন ভাষা চর্চা কেন্দ্র, ছৌ বিভাগ, সিধো কানহো বীরসা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইংরেজি বিভাগ, কোচবিহার পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়ের যুগ্ম উদ্যোগে। মাত্র ২৮ বছর বয়সেই Ph.D. অর্জন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হয়ে, তথ্যচিত্র পরিচালনা করে অবাক করে দিয়েছেন এই বিস্ময়বালক তথা পুরুলিয়া জেলার আড়ষা থানার অন্তর্গত ফস্কো গ্রাম নিবাসী ডঃ শক্তিপদ কুমার (Dr. Shaktipada Kumar)।

ছৌ নাচ
ছৌ নাচ

Documentary Film By Dr. Shaktipada Kumar যা ইতিমধ্যেই ইউটিউবে ভাইরাল :

কেমন লাগলো অবশ্যই জানান

SHARE